মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় আবারো বাড়ল নীতি সুদহার

দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শুধু সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন

বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বৃদ্ধি মৌলিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও সে পথেই হাঁটছে। বাজারে অর্থ সরবরাহের লাগাম টেনে ধরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় দফায় দফায় বাড়াচ্ছে নীতি সুদহার।

বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বৃদ্ধি মৌলিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও সে পথেই হাঁটছে। বাজারে অর্থ সরবরাহের লাগাম টেনে ধরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় দফায় দফায় বাড়াচ্ছে নীতি সুদহার। ২০২২ সালের মে মাসে নীতি সুদহার ছিল ৫ শতাংশ। সে সময় থেকে এখন পর্যন্ত মোট ১১ বার বাড়ানো হয়েছে নীতি সুদহার। চলতি বছরে চার দফা এ সুদহার বাড়ানোর পর সম্প্রতি আবারো ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে তা ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে।

সাধারণত বাজারে অর্থপ্রবাহ বেড়ে গেলে এবং সে কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়লে, অর্থপ্রবাহ কমাতে নীতি সুদহার বাড়াতে হয়। নীতি সুদহার বেড়ে গেলে দেশের ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত হয়। আবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের যে ঋণ দেয়, তার সুদহারেও এর প্রভাব পড়ে। এতে গ্রাহকরাও ঋণ গ্রহণে নিরুৎসাহিত হয়।

বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি মুদ্রা সরবরাহজনিত কারণে নয়। ফলে নীতি সুদহার বাড়ানোর খুব একটা প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে দেখা যাচ্ছে না। টানা দুই বছরেরও অধিক সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, কমবেশি ৯ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি এখনো ১০ শতাংশের আশেপাশে। সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। এছাড়া সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৪০ শতাংশে, যা আগস্টে ছিল ১১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় বাড়তি দাম গুনতে গিয়ে আর্থিক চাপে রয়েছে জনসাধারণ। নীতি সুদহার এভাবে বারবার বাড়ানোয় উল্টো বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমেছে এবং এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা কমছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যবসা-বাণিজ্যসহ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এক ধরনের শ্লথগতি নেমে এসেছে। এর প্রভাবে উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটছে যা পক্ষান্তরে বাজারদর আরো উসকে ‍দিচ্ছে। চলতি মাসে বাজারে প্রায় প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়ে। বিশেষ করে ডিম ও মুরগির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। সরকার কিছু পণ্যে আমদানি শুল্ক কমানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। এতে ডিমসহ কিছু পণ্যের দাম কিছুটা কমলেও চাল, ভোজ্যতেল, চিনি ও পেঁয়াজসহ নিত্যভোগ্যপণ্যের বাজারে কোনো স্বস্তি নেই। উপরন্তু আগে থেকে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট, ভঙ্গুর বাজার ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সব মিলিয়ে মূল্যস্তর ফুলেফেঁপে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে কেবল সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরতে হলে সমন্বিত পদক্ষেপ লাগবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে একা কেবল সংকোচানমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব নয়।

বছরখানেক আগে ব্যাংক ঋণে সর্বোচ্চ সুদহার ছিল ৯ শতাংশ। বর্তমানে কোনো কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৫ শতাংশ সুদহার রয়েছে। সব ব্যাংক মিলিয়ে ঋণের গড় সুদহারও ক্রমেই বাড়ছে। একদিকে উচ্চ সুদহারের কারণে ঋণ নেয়া থেকে বিরত থাকছেন ব্যবসায়ীরা, অন্যদিকে তারল্য সংকটে থাকায় গ্রাহকের টাকা দিতে পারছে না কয়েকটি ব্যাংক। এতে ব্যবসা কার্যক্রম পরিচালনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। আবার দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচারে নতুন বিনিয়োগের মাত্রাও কমেছে যা বেসরকারি খাতে তারল্য সংকট আরো বাড়িয়ে তুলেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি স্থবির হয়ে আছে। এ পরিস্থিতিতে নীতি সুদহার বাড়ানো বেসরকারি খাতের জন্য বড় দুঃসংবাদ।

তাই মূলস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেবল সুদহার না বাড়িয়ে সংশ্লিষ্ট অন্য সমস্যাগুলো সমাধানের দিকে সমান নজর দিতে হবে।

অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। এর জন্য কেবল বাজার তদারক করলেই চলবে না। সমস্যার মূল চিহ্নিত করে তা সমাধান করতে হবে। নিত্যপণ্যের বাজারে চাহিদামাফিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য উৎপাদন পর্যায়ে ঘাটতি থাকলে আমদানির ব্যবস্থা নিতে হবে। আমদানি ব্যয় কমাতে শুল্কহার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। আমদানি সংক্রান্ত জটিলতাগুলো দূর করতে হবে। সর্বোপরি বাজার ব্যবস্থাপনায় যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতি আছে তা দূর করে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। কেননা এতে ভোক্তারা লাভবান হবে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে সরকারের রাজস্ব নীতিতে পরিবর্তন আনা। করজালের আওতা বাড়লে মানুষের ব্যয়যোগ্য আয়ের পরিমাণ কমে যায়। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে যেখানে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে, সেখানে করারোপের ক্ষেত্রগুলো খুব সতর্কভাবে নির্ধারণ করতে হবে। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন অনুৎপাদনশীল খাতে খরচ কমিয়ে উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বাড়াতে পারে। এতে বাজারের চাহিদামাফিক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে উৎপাদনশীল খাতে ভর্তুকি বাড়িয়ে উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব। এর প্রভাবে বাজারদর কমে আসতে পারে।

সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মৌলিক উপায় হলেও এটি দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় খুব বেশি ফলপ্রসূ নয়। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের যে দুর্দশা এতে আমানতের ওপর সুদহার বাড়লেও বর্তমানে আমানত প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। কারণ মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে এ খাতের ওপর। আবার জনসংখ্যার বড় একটা অংশ ব্যাংক খাতের আওতায় নেই। ফলে নীতি সুদহার বাড়িয়ে টাকার প্রবাহ কমানোর প্রভাব পশ্চিমা বিশ্বে দেখা গেলেও দেশে খুব একটা কার্যকর হচ্ছে না। এ অবস্থায় নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি আংশিক কমানো যেতে পারে। তবে সহনীয় পর্যায়ে আনতে হলে সমন্বিত পদক্ষেপের বিকল্প নেই।

আরও